কলকাতার নাখোদা মসজিদ স্থাপত্যের এক বিস্ময়কর সৃষ্টি

কলকাতার মুসলমানদের প্রধান প্রার্থনালয় ‘নাখোদা মসজিদ’। বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের এটি সবচেয়ে বড় আর প্রাচীন মসজিদ। এটি মধ্য কলকাতার বড়বাজারের চিৎপুর অঞ্চলে অবস্থিত। মসজিদটি মহাত্মা গান্ধী রোড থেকে রবীন্দ্র সরণি ধরে দক্ষিণমুখী ৫ মিনিটের পথে জাকারিয়া স্ট্রিটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। অনেক দূর থেকেই লাল রঙের এ দৃষ্টি নন্দন মসজিদটি যে কোনো মানুষের নজরে পড়বে।

আগ্রায় অবস্থিত প্রভাবশালী মুঘলসম্রাট আকবরের সমাধির আদলে ইন্দো-সেরা সৈনিক শৈলীতে লাল-বেলেপাথরে বিখ্যাত এ মসজিদটি নির্মিত হয়। আর মসজিদটির প্রবেশে পথ বানানো হয় আগ্রার ফতেহপুর সিক্রির বুলন্দ দরজার আদলে। মসজিদটি তৈরি করেছিলেন কচ্ছের নামের একটি ক্ষুদ্র সুন্নি মুসলিম সম্প্রদায় ‘কাচ্ছি মেমন জামাত’।

মসজিদ নির্মাণে অর্থ দান করেন সেই সম্প্রদায়ের নেতা আব্দুর রহিম ওসমান। তিনি পেশায় সমুদ্র বণিক। জাহাজে জাহাজে নাবিকের মতো ঘুরতেন। তার সঙ্গে মিল রেখেই মসজিদটির নামকরণ করা হয়। ফারসি শব্দ নাখোদার অর্থ নাবিক। এটিই বর্তমান কলকাতার সবচেয়ে বড় মসজিদ। মসজিদের চাতালটি অনেক বড় এবং দ্বিতল। মসজিদের ইমাম এবং খতিব মাওলানা মোহাম্মদ শফিক কাশেমি যুগান্তরকে জানান, মসজিদটিতে এক সঙ্গে ১৫ হাজার মানুষ নামাজ আদায় করতে পারেন। ঈদের দিন এ মসজিদ প্রাঙ্গণকে কেন্দ্র করে লাখের বেশি মানুষ এখানেই জামাত আদায় করেন।

শুক্রবারেও দেখা যায় উপচে পড়া ভিড়। ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা শুধু নামাজ পড়তেই নয়, মসজিদটি দেখতেও প্রতিনিয়ত আসেন।
১৯২৬ সালে তৈরি নাখোদা মসজিদ স্থাপত্যের দিক থেকে বিস্ময়কর সৃষ্টি। সাদা মার্বেলের দেয়াল, বেলজিয়াম কাঁচ, বিশাল নামাজ পড়ার জায়গা, দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো কাঠের ঘড়ি— ভাঁজে ভাঁজে ইতিহাসের গন্ধ। তৎকালিন সময়ে মসজিদটি নির্মাণে খরচ হয়েছিল ১৫ লাখের বেশি রুপি। যা বর্তমান বাজারমূল্যে নিঃসন্দেহে কয়েকেশ’ কোটি টাকা।

মসজিদটিতে একটি গম্বুজ, দু’টি বড়ো মিনার ও ২৫টি ছোট মিনার রয়েছে। বড় মিনার দু’টির উচ্চতা ১৫১ ফুট আর ছোট মিনারগুলোর উচ্চতা ১০০ ফুট থেকে ১১৭ ফুটের মতো। চাতাল দু’টি নির্মিত হয়েছে দুর্লভ গ্রানাইট পাথর দিয়ে। পাথরগুলো বিহারের তোলেপুর থেকে সংগ্রহ করা হয়। মসজিদটির ভেতরে রয়েছে চোখ ধাঁধানো অলঙ্করণ ও সৃজনশীলতা। মসজিদকে কেন্দ্র করে আশেপাশে দুর্লভ কিছু সুগন্ধি আতর পাওয়া যায়। হরিণের কস্তুরীর থেকে তৈরি হওয়া আতরও পাওয়া যায়। এছাড়া বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং তুরস্কের নকশী টুপিও পাওয়া যায় এখানে। প্রত্যেক বছর ঈদ বা রমজানকে কেন্দ্র করে নতুনভাবে সেজে ওঠে এই নাখোদা মসজিদ।

পাঠকের মতামত