রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তরে বাধা : প্রাণহানি হলে আপনারা দায়ী

পররাষ্ট্রমন্ত্রীভাসানচরে দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা খরচে রোহিঙ্গাদের জন্য সাময়িক বাসস্থানের ব্যবস্থা করেছে সরকার। তবে জাতিসংঘসহ আরও কয়েকটি পশ্চিমা দেশ রোহিঙ্গাদের সেখানে স্থানান্তরে বাধা দিচ্ছে। এ অবস্থায় আগামী বর্ষায় কক্সবাজারে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা ভূমিধসসহ অন্য কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণ হারালে তার জন্য বাংলাদেশ নয় বরং জাতিসংঘসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো দায়ী থাকবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আব্দুল মোমেন। বৃহস্পতিবার (২৫ এপ্রিল) সকালে জাতিসংঘের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার প্রধানরা মন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে আসলে তিনি শক্ত ভাষায় এ কথা জানিয়ে দেন।

জাতিসংঘ শরনার্থী সংস্থার হাই কমিশনার ফিলিপো গ্র্যান্ডি, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার মহাপরিচালক অ্যান্টনিও ভিটোরিনো এবং জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক আন্ডার-সেক্রেটারি জেনারেল মার্ক লোকক মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকের পরে মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‌‘আমরা বলেছি আমরা কিছু লোককে ভাসানচরে নিয়ে যেতে চাই। কারণ আগামী বর্ষা মৌসুমে অনেক বেশি বৃষ্টিপাত হবে। এসময় ভূমিধসে প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। আর প্রাণহানির ঘটনা ঘটলে আমরা দায়ী থাকবো না। যারা বাধা দিচ্ছে তারা এর জন্য দায়ী থাকবে।’

তবে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা জোর করে কাউকে ভাসানচরে নেবো না। তবে যারা যাবে তাদের জন্য একটি ভালো অবস্থান হবে। আমরা নিজের পয়সায় দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ভাসানচরে আবাসনের ব্যবস্থা করেছি। ওখানে গেলে পরে রোহিঙ্গারা অর্থনৈতিক কাজকর্ম করতে পারবে। মাছ ধরতে পারবে, গরু পালন করতে পারবে।’

বাংলাদেশ থেকে বিদায় হন
সাক্ষাৎকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাতিসংঘের তিন সংস্থার প্রধানকে বাংলাদেশে কাজ কমিয়ে মিয়ানমারে কাজ বাড়ানোর তাগিদ দেন। মন্ত্রী বলেন, ‘আমি বলেছি আপনাদের এখানে কাজ নাই, মিয়ানমারে যান। আমি বেশ শক্তভাবে বলেছি।’

মন্ত্রী আরও বলেছেন, ‘আপনারা ওখানে বেশি জোর দেন, এখানে না। আমি জিজ্ঞাসা করেছি আপনারা কতবার সেখানে গিয়েছেন, সেখানে আপনাদের কতলোক কাজ করে। এখানে এক হাজারের বেশি লোক কাজ করে। ওখানে বেশি কাজ করেন, এখান থেকে বিদায় হোন। আপনারা মিয়ানমারকে কনভিন্স করেন, যাতে তারা তাদের লোক নিয়ে যায় এবং ওখানে একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে কাজ করেন।’

রোহিঙ্গারা কক্সবাজারে ঝামেলা তৈরি করছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘স্থানীয় জনগণ খুব আপসেট, যে এরা দিনে দিনে ঝামেলার সৃষ্টি করছে। আমরা বলেছি ওদের সংখ্যা এত যে তারা আমাদের বনজঙ্গল সব উজাড় করে দিচ্ছে।’

বিশ্ব জনমত
পররাষ্ট্রমন্ত্রী তিন সংস্থার প্রধানকে রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী ও সুষ্ঠু সমাধানের জন্য বিশ্ব জনমত তৈরির আহ্বান জনান। মন্ত্রী বলেন, ‘এতবড় সংস্থার প্রধান আপনারা এবং আপনারা বিশ্বব্যপী জনমত তৈরি করতে পারেন। আমার ধারণা জনমত তৈরি করতে পারলে সবচেয়ে বড় অত্যাচারী শাসকেরও পতন হয়।’

দায়বদ্ধতা
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বৈঠকে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের অপর যে বর্বর নির্যাতন চালিয়েছে ও অপরাধ সংঘটিত করেছে তার দায় তাদের নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বলেছি দায়বদ্ধতা থাকা উচিত। আমরা তাদের বলেছি আপনাদের বন্ধুপ্রতিম দেশ যেমন- জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর কিংবা ইউরোপিয় ইউনিয়নকে বলেন মিয়ানমারকে চাপ দিতে। কারণ মিয়ানমারের বেশিরভাগ ব্যবসা ইউরোপিয় ইউনিয়নের সঙ্গে, জাপান সেখানে বিনিয়োগ করেই চলেছে, ব্যাংকিং চালায় সিঙ্গাপুর। আপনারা সেখানে চাপ দিলে তারা মিয়ানমারকে চাপ দেবে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার জন্য।’

মন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমরা তাদের বলেছি সমস্যার দ্রুত সমাধান না করা গেলে রোহিঙ্গা যুবকরা উগ্রবাদের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। এখানে উগ্রবাদ হলে গোটা অঞ্চলের জন্য খারাপ হবে বলে হুঁশিয়ার করেছি।’

মন্ত্রী বলেন, ‘এটা হলে মিয়ানমারের দুঃখ আছে। চীনের উদ্দেশ্য সেটা সফল হবে না, অর্থনৈতিক কোনো কাজ হবে না।’

পাওয়ারফুল দেশ
বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সমস্যা শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করতে চায় এবং কোনও ধরনের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে চায় না। মন্ত্রী বলেন, ‘সমস্যা মিয়ানমার তৈরি করেছে, সমাধানও তাদের করতে হবে। আমরা যুদ্ধ করবো না, আমরা শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করতে চাই। আমাকে কেউ কেউ বলেছে তোমরা যদি চাও তবে আমরা সেখানে কিছু একটা মহড়া করতে পারি।”

এরা কারা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অত্যন্ত পাওয়ারফুল লোক বলেছেন।’

এটি ব্যক্তি না দেশ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দেশ। আমরা খুব একটা পাত্তা দেই নাই। তারা বলেছেন তোমরা চাইলে আমরা তোমাদের হয়ে ক্ষমতা দেখাতে পারি। আমরা বলেছি না, কারণ আমরা শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করতে চাই। মিয়ানমার এর আগে লোক নিয়ে গেছে এবং আমরা আশাবাদী।’

অস্ত্র সরবরাহ
তিন সংস্থার প্রধানকে মন্ত্রী রাখাইনে কারা অস্ত্র সরবরাহ করছে সেটি খুঁজে বের করার পরামর্শ দিয়ে বলেন এর ফলে কে বা কারা এর পেছনে আছে আমরা তা জানতে পারবো।

মন্ত্রী বলেন, ‘আমি তাদের বলেছি রাখাইনে কে বা কারা অস্ত্র সরবরাহ করেছে? ওখানে মারামারি হচ্ছে কে অস্ত্র সরবরাহ করছে আপনারা সেটি বের করেন।’

তিনি বলেন, বিভিন্ন জায়গায় সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটছে এবং বিভিন্ন তথ্য আমরা পাই। কিন্তু মিডিয়াতে কখনো আসে না অস্ত্র কোন দেশের তৈরি, কোন কোম্পানির তৈরি বুলেটে বা শ্রাপনেলে লোকটা মারা গেছে।

মন্ত্রী বলেন, ‘এখন এটি জানার সময়, কারা এইসব অস্ত্র সরবরাহ করছে। এগুলো জানা গেলে সন্ত্রাস কমে যাবে।’

স্কুলিং
রোহিঙ্গারা যখন রাখাইনে ছিল তখন তাদের বাচ্চাদের শিক্ষার বিষয়ে জাতিসংঘ বা অন্যদেশগুলো কোনও কথা না বললেও বাংলাদেশে অবস্থিত রোহিঙ্গা বাচ্চাদের বাংলা শিক্ষার বিষয়ে তারা অনেক আগ্রহী।

এ বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা জানি ওখানে অনেক বাচ্চা আছে এবং তাদের স্কুলিং হওয়া উচিত। কিন্তু উচিত হবে তাদের মিয়ানমারের ভাষা শেখা ও মিয়ানমারের ইতিহাস জানা। আমাদের এ ধরনের কোনও ব্যবস্থা নেই। সুতরাং তাদের ফেরত যাওয়া উচিত এবং সেখানে তারা শিক্ষা গ্রহণ করুক।’

পাঠকের মতামত