মালয়েশিয়া গমন ইচ্ছুক বাংলাদেশীদের দারুন সুখবর!

বাংলাদেশি ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সি একচেটিয়া ভাবে ও দুর্নীতির মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক নিয়োগ করছে এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গেল বছরের সেপ্টেম্বর মাস থেকে এসপিপিএ সিস্টেমের মাধ্যমে নতুন শ্রমিক নিয়োগ বন্ধ রাখে মালয়েশিয়ার সরকার। জিটুজি প্লাস থেকে সরে এসে পুরনো পদ্ধতিতে (জিটুজি) লোক নিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করলেও ৭ মাস ধরে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে মধ্যপ্রাচ্যের পর সবচেয়ে বড় এই শ্রমবাজার। মালয়েশিয়া সরকার এই বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে জয়েন্ট টেকনিক্যাল কমিটির বৈঠক করলেও এই বাজার নিয়ে এখনও কোনও বিষয় স্পষ্ট নয়। সর্বশেষ মালয়েশিয়া সরকার জানিয়েছে বিদেশি শ্রমিকদের জন্য একটি অনলাইন জব পোর্টাল খোলা হবে, যার মাধ্যমে সেদেশে নতুন শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হবে।

কিন্তু কবে নাগাদ চালু হবে সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা নেই সংশ্লিষ্ট কারও। তবে আশার কথা জানিয়েছেন মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রী এম কুলাসেগেরান। তিনি বলেছেন, মালয়েশিয়া সরকারের অনলাইন মাধ্যমে নতুন লোক নিয়োগের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে, বিশেষ করে নেপাল এবং বাংলাদেশের জন্য কয়েক মাসের মধ্যে চূড়ান্ত হবে।জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর দেওয়া তথ্যমতে, ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে মালয়েশিয়ায় গেছেন ১৮ হাজার ৮৯৩ জন। এরপর ডিসেম্বর মাসে গেছেন ১ হাজার ৪৭৬ জন। এই বছর জানুয়ারি মাসে ২১ জন, ফেব্রুয়ারি মাসে ১৪ জন এবং মার্চ মাসে ২০ জন মালয়েশিয়ায় গেছেন।

সর্বশেষ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে এমন স্থবিরতা দেখা গিয়েছিল ২০০৯ সালের পর। বাংলাদেশি জনশক্তি রফতানির অন্যতম এই বাজার ২০০৯ সালে কর্মী নেওয়া বন্ধ করে দেয়। এরপর আবার ২০১২ সালের ২৬ নভেম্বর জনশক্তি রফতানিকারকদের বাদ দিয়ে সরকারিভাবে দেশটিতে কর্মী পাঠাতে জিটুজি চুক্তি করা হয়। এরপর আবারও জনশক্তি রফতানিকারকদের যুক্ত করে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশের মধ্যে জি টু জি প্লাস (সরকারি-বেসরকারি) সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। তবে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার ১২ ঘণ্টার মধ্যেই মালয়েশিয়া বলে, এই মুহূর্তে তারা আর কর্মী নেবে না। এতে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া ঝুলে যায়। এরপর ২০১৬ সালের নভেম্বরে মালয়েশিয়ার মন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে আসে। ওই বৈঠকের পর আবার কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়।

সর্বশেষ ২০১৮ সালে আবারও মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো নিয়ে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হলে মালয়েশিয়া সরকার এবং পরে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ঘোষণা দেয় ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সির পরিবর্তে নিবন্ধিত সব রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠাতে পারবে বাংলাদেশ। আর পুরানো এসপিপিএ অনলাইন প্রক্রিয়া বাতিল করে নতুন প্রক্রিয়ায় এই নিয়োগ করা হবে। এসপিপিএ সিস্টেম সচল রাখা হয় ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। সেপ্টেম্বরের পর ওই সময়ের মধ্যে ৫০ হাজার ১০৮ জন কর্মী মালয়েশিয়া গিয়েছে বলে জানিয়েছে বিএমইটি।

মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ এবং নেপাল থেকে নতুন করে শ্রমিক নেওয়ার জন্য একটি অনলাইন জব পোর্টাল খোলা হচ্ছে। এই অনলাইন পোর্টাল থেকে চাকরি প্রত্যাশীরা নিজেরাই চাকরি খুঁজতে পারবেন এবং নিয়োগকর্তারাও চাকরির জন্য লোক নিয়োগ করতে পারবেন। নতুন এই প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করা ইন্ডিপিডেন্ট ফরেন ওয়ার্কার্স কমিটি ইতোমধ্যে রিপোর্ট তৈরি করেছে। এই রিপোর্ট কেবিনেট থেকে অনুমোদনের পর প্রক্রিয়ার কাজ শুরু হবে বলে জানা গেছে।

এই রিপোর্টে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগে নতুন কী ব্যবস্থা নেওয়া যায় বিভিন্ন দেশের এ ধরনের লোক নিয়োগ প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে সে বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছে। কেবিনেট অনুমোদন দেওয়ার পর মালয়েশিয়ান কোম্পানি কিংবা ব্যক্তিপর্যায়ে বিদেশি শ্রমিক নিজেরাই নিয়োগ করতে পারবে। যার যেসব ক্যাটেগরির শ্রমিক প্রয়োজন তারা নিজেরাই তা বেছে নিতে পারবে পোর্টালের মাধ্যমে। এই পোর্টালের তদারকি করবে মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়। কেন্দ্রীয়ভাবে এই পোর্টালের নাম প্রাথমিকভাবে দেওয়া হচ্ছে মালয়েশিয়ান রিক্রুটিং এজেন্সি (এমআরএ)। এই পোর্টাল শুধুমাত্র বিদেশি শ্রমিকদের বিষয়ে কাজ করবে।

এছাড়া আরও জানা গেছে, মালয়েশিয়ান নিয়োগকর্তাকে ২ লাখ ৫০ হাজার রিঙ্গিত সিকিউরিটি ডিপোজিট হিসেবে সরকারের কাছে জমা রাখতে হবে। যদি কোনও নিয়োগকর্তা শ্রমিকের পারিশ্রমিক দিতে ব্যর্থ হয় কিংবা নির্যাতন করে অথবা অসদাচরণ করে, তাহলে এই সিকিউরিটি ডিপোজিট থেকে শ্রমিককে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।

মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী এম কুলাসেগেরান সেদেশের গণমাধ্যমকে বলেন, সরকারের নতুন প্রক্রিয়া চূড়ান্তকরণের দ্বারপ্রান্তে। কয়েক মাসের মধ্যেই নতুন এই প্রক্রিয়াটি চালু হবে। মধ্যসত্ত্বভোগীদের কারণে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যে সমস্যা হচ্ছে এ বিষয়ে সরকার অবগত আছে। নতুন পোর্টালটি চালু হওয়ার পর যার যার প্রয়োজন অনুযায়ী ক্যাটেগরিভিত্তিক শ্রমিক নিয়োগ করতে পারবে। নতুন আবেদন আসার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এমআরএ’কে জবাব দিতে হবে।

মালয়েশিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রাখছে হাইকমিশন। হাইকমিশনের কর্মকর্তারা আশা করছেন, খুব দ্রুত আবারও সচল হবে মালয়েশিয়ায় নতুন শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়া।
হাইকমিশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, মালয়েশিয়ায় নতুন প্রক্রিয়ার বিষয়ে অনেকটাই এগিয়ে নিয়ে এসেছে সেদেশের সরকার। আমরা আশাবাদী দ্রুতই সচল হবে। নতুন সরকার যেহেতু এসেছে, তারা একটি সমন্বিত পদ্ধতি চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে। তারা চাচ্ছে সব দেশের জন্য একই নিয়োগ প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে। তারা সেই প্রক্রিয়া নির্ধারণের কাছাকাছি চলে এসেছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করছি।

অন্যদিকে, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে সূত্রে জানা যায়, মালয়েশিয়ার সরকারের সঙ্গে দ্রুত আরেকটি জয়েন্ট টেকনিক্যাল কমিটির বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা আছে। মালয়েশিয়ার বাজার আবারও সচল করার জন্য প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ইমরান আহমদ ইতোমধ্যে মালয়েশিয়া যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তবে তার সফর এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব রৌনক জাহান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আগে যে সিস্টেমে মালয়েশিয়া লোক নিতো তারা তো সেটা বাতিল করেছে। এখন তারা নতুন একটি সিস্টেম নিয়ে কাজ করছে। তাদের সঙ্গে আমাদের কয়েকদফা বৈঠক হয়েছে। তারা তাদের ভেতরেই প্রক্রিয়াটিকে অরগানাইজ করছে বলে আমরা শুনেছি। আর এইদিক নিয়ে আমরাও প্রস্তুতি নিচ্ছি নতুন ব্যবস্থায় লোক পাঠানোর বিষয়ে। তারা দ্রুত কাজগুলো শেষ করবে বলে আমরা জেনেছি। তবে কবে নাগাদ শেষ হবে এই ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনও তথ্য তারা জানায়নি। তারা বরাবরই বলছে আমরা শিগিগিরই চালু করবো। আমরাও আমাদের তরফ থেকে ডাটাবেজ তৈরি করা থেকে শুরু করে যাবতীয় প্রস্তুতি নিচ্ছি।

মালয়েশিয়ার বিষয়ে আলোচনা করতে আগামী সপ্তাহে প্রতিমন্ত্রী ইমরান আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে জনশক্তি রফতানিকারকদের সংগঠন বায়রা। সংগঠনটির মহাসচিব শামিম আহমেদ চৌধুরী নোমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রতিমন্ত্রী মহোদয় দেশের বাইরে ছিলেন প্রায় এক মাস। উনি এসেছেন মাত্র। আমরা আগামী সপ্তাহে মালয়েশিয়া নিয়ে বৈঠক করবো। তখন একটা আপডেট হয়তো জানা যেতে পারে।’

পাঠকের মতামত