নুসরাতকে পুড়িয়ে মারতে বলেছিলাম: অধ্যক্ষ সিরাজ

ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন নিপীড়নের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে জেলহাজতে থাকা অবস্থায় ওই শিক্ষার্থীকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন অধ্যক্ষ (বর্তমানে বরখাস্ত) এস এম সিরাজ উদ দৌলা। দুই অনুগত ছাত্র নুর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম জেলখানায় সিরাজের সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনি নুসরাতকে চাপ দিয়ে মামলা প্রত্যাহার করাতে বলেন। এতে কাজ না হলে তাকে পুড়িয়ে হত্যার পর ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে চালানোর নির্দেশনাও দেন তিনি।

গতকাল রবিবার ফেনীর আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে আলোচিত এ হত্যা মামলার প্রধান আসামি সিরাজ এসব জানিয়েছেন। তাঁকে নিয়ে এ পর্যন্ত মামলার ৯ আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিল। সিরাজের জবানবন্দির সঙ্গে আগের আটজনের জবানবন্দির মিল আছে। এ ছাড়া মৃত্যুর আগে নুসরাত যে জবানবন্দি দিয়ে গেছে তার সঙ্গে আসামিদের স্বীকারোক্তির মিল আছে। নুসরাতের জবানবন্দি অনুযায়ী তাকে পরীক্ষার হল থেকে কৌশলে মাদরাসার প্রশাসনিক ভবন কাম সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে ডেকে নিয়ে প্রথমে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়। এতে রাজি না হলে সিরাজের অনুগত চারজন মিলে তাঁর গায়ে আগুন দেয়।

এরপর সিরাজের সহযোগী, স্থানীয় পুলিশ ও কয়েকজন সাংবাদিক ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে আত্মহত্যা বলে প্রচার চালায়। এ হত্যাকাণ্ডে অর্থ লেনদেনের সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে বলেও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) জানিয়েছে। বিষয়টি অনুসন্ধান করছে তারা। গতকাল বিকেল ৩টা থেকে রাত প্রায় ৯টা পর্যন্ত একটানা ছয় ঘণ্টা সিরাজের জবানবন্দি রেকর্ড করেন ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচার বিভাগীয় হাকিম মো. জাকির হোসাইন। রাতে এ বিষয়ে উপস্থিত সাংবাদিকদের অবহিত করেন মামলার তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ইকবাল।

পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘নুসরাত জাহান রাফি হত্যার মামলার প্রধান আসামি অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে তিনি জানিয়েছেন, জেলহাজত থেকে তিনি নুসরাতকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন। জেলে থাকা অবস্থায় নূর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলে নুসরাতকে মামলা তুলে নিতে চাপ দেওয়ার জন্য বলেন সিরাজ। কাজ না হলে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিতেও নির্দেশ দেন তিনি।’ এর আগে গত ১০ এপ্রিল ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচার বিভাগীয় হাকিম আদালতে সিরাজের সাত দিনের রিমান্ড চাইলে বিচারক শরাফ উদ্দিন আহমেদ পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

পিবিআই ও আদালত সূত্র জানায়, গত ২৭ মার্চ নুসরাতের মায়ের করা যৌন নিপীড়নের মামলায় গ্রেপ্তার হন অধ্যক্ষ সিরাজ। পরদিন ২৮ মার্চ ফেনী কারাগারে তাঁকে দেখতে যায় তাঁর অনুগত ছাত্র, হত্যা মামলার দুই নম্বর আসামি নূর উদ্দিন ও তিন নম্বর আসামি শাহাদাত হোসেন শামীম। এ সময় জেলের সাক্ষাৎ কক্ষে ভেতরের প্রান্তে ছিলেন সিরাজ এবং বাইরের প্রান্তে ছিলেন নুর ও শামীম। তারা সিরাজকে তাঁর মুক্তির দাবিতে সোনাগাজীতে মিছিল-সভা হয়েছে বলে জানান। ‘সিরাজ মুক্তি পরিষদ’ গঠনের কথাও তাঁকে অবহিত করে তারা। একপর্যায়ে সিরাজ বলেন, ‘তোমরা কিছু একটা করো। তোমরা ওই রাফিকে মামলাটি তুলে নিতে চাপ দাও।

সে যদি কোনো কারণে রাজি না হয় তবে পরিকল্পনা করে তাকে হত্যা করো।’ দুই অনুগত ছাত্র ও ক্যাডার সিরাজের এই কথায় সায় দেয় এবং তাঁর কথামতো কাজ হয়ে যাবে বলে তাঁকে আশ্বস্ত করে। এর আগে গত ১৪ এপ্রিল রাতে নুর উদ্দিন ও শামীম ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচার বিভাগীয় হাকিম শরাফ উদ্দিন আহমদের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। জবানবন্দিতে তারা জানায়, কারাগারে দেখা করতে গেলে অধ্যক্ষ সিরাজ নুসরাতকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সূত্র জানায়, টানা ছয় ঘণ্টার জবানবন্দিতে সিরাজ কেন নুসরাতের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন সেটা বর্ণনা করেছেন।

একই সঙ্গে তাঁর অনুগতরা কেন নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যা করে তাও বলেন তিনি। সিরাজ দাবি করেন, নুসরাত একজন আলেমের সম্মান ক্ষুণ্ন করেছে—এটিই তিনি শিষ্যদের বলেছেন। এরপর তাঁর অনুগতরা পরিকল্পিতভাবে নুসরাতকে হত্যা করে। গত ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা দিতে গেলে নুসরাতকে মাদরাসার প্রশাসনিক ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে তাঁর শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয় সিরাজের অনুসারীরা। ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। আগুন দেওয়ার ঘটনার পর ৭ এপ্রিল নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান মামলা করেন।

সে মামলাটি পরে হত্যা মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়। তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় পিবিআইকে। এ মামলায় এখন পর্যন্ত ২১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নুসরাত হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে এ পর্যন্ত আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, জাবেদ হোসেন, জোবায়ের আহমেদ, উম্মে সুলতানা পপি, কামরুন নাহার মণি, আবদুর রহিম ওরফে শরীফ ও হাফেজ আবদুল কাদের। তারা নুসরাতকে হত্যার আগে বৈঠক করে পরিকল্পনা করা, কারা কি দায়িত্ব পালন করবে সেটা ঠিক করে রাখার কথা জানিয়েছে।

এ ছাড়া নুসরাতকে ছাদে ডেকে নিয়ে যাওয়া, তাকে মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেওয়া ও হাত-পা বেঁধে এবং বুকের ওপর বসে চেপে ধরে কেরোসিন ঢেলে দেওয়ার পর আগুন ধরিয়ে দেওয়ার বিস্তারিত বর্ণনা তাদের জবানবন্দিতে এসেছে। গ্রেপ্তারকৃত অন্যদের মধ্যে আছেন অধ্যক্ষ সিরাজের আশ্রয়দাতা হিসেবে পরিচিত সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি রুহুল আমিন, অর্থদাতা পৌর কাউন্সিলর ও পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম ও মাদরাসার শিক্ষক আফছার উদ্দিন।

পাঠকের মতামত