মুহাম্মদ সা: কবরে সশরীরে জীবিত এবং কেয়ামত পর্যন্ত সব কিছু দেখবেন!

মাদরাসার পাঠ্যবইয়ে লেখা হয়েছে হজরত মুহাম্মদ সা: কবরে সশরীরে জীবিত আছেন। তিনি আমাদের আমলসমূহ পর্যবেক্ষণ করছেন। কেয়ামত পর্যন্ত সৃষ্টির সব অবস্থা তিনি অবলোকন করবেন। মৃত্যুর পরপরই তার রূহ মোবারককে আবার দেহ মোবারকে ফেরত দেয়া হয়েছে।
অষ্টম শ্রেণীর জন্য পাঠ্য আকাইদ ও ফিকহ বইয়ের ৫৪ পৃষ্ঠার একটি পাঠের শিরোনাম ‘রসুল সা. হায়াতুন্নবি’। এখানে লেখা হয়েছে ‘মহানবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের জীবন শুরু হয় সৃষ্টির সূচনাতে যখন আল্লাহ ছাড়া কিছুই ছিল না। তিনি প্রকাশ পান ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে, ইন্তেকালের পরও আবার জীবন লাভ করেন। রওযা পাকে সশরীরে তিনি জীবিত আছেন এটাই আহলে সুন্নত ওয়াল জামা’তের আকিদা’।

এরপর এ পৃষ্ঠায় আরো লেখা হয়েছে ‘নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রওযা মোবারকে দাফন করার পরপরই আল্লাহ তায়ালা তাঁর রুহ মোবারককে ফেরত দেন এবং রুহ মোবারক দেহ মোবারকের মধ্যে কেয়ামত পর্যন্ত সব সময় অবস্থান করতে থাকবে, যাতে তিনি তার প্রতি দরুদ ও সালাম পেশকারি উম্মতের সালামের জবাব দিতে পারেন (সিফাউস সিকাম-আল্লামা সুবকি)। তাই আমাদের এ বিশ্বাস রাখতে হবে যে, প্রিয়নবি রওযা পাকে সশরীরে জীবিত। তিনি উম্মতের সালামের জবাব দিচ্ছেন।’

অষ্টম শ্রেণীর আকাইদ ও ফিকহ বইটির চতুর্থ অধ্যায়ের নাম ‘আল ইমান বির রসুল। এ অধ্যায়ের অধীনে ৫০ পৃষ্ঠায় একটি পাঠ হলো নবি সা. এর আগমনের উদ্দেশ্য। এখানে হযরত মুহম্মদ সা. সম্পর্কে লেখা হয়েছে ‘কিয়ামত পর্যন্ত সকল সৃষ্টির অবস্থা অবলোকন করবেন এবং আল্লাহর দরবারে সাক্ষ্য দেবেন।’ মাদরাসায় নবম-দশম শ্রেণীর জন্য পাঠ্য আকাইদ ও ফিকহ বইয়ের ২৬ পৃষ্ঠায় তৃতীয় অধ্যায়ের শিরোনাম হলো ‘ইমান বির রসুল’। এখানে মহানবী সা: কবরে সশরীরে জীবিত এ দাবির পক্ষে ব্যাখ্যা দিয়ে লেখা হয়েছে ‘নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকালের পর এক বিশেষ ধরনের জীবন রয়েছে,তার শারীরিকভাবে বিদ্যমানতা ও বরযখী জীবন প্রণিধানযোগ্য।

অকাট্য দলিলের আলোকেই সকল নবি আপন আপন মাযারে জীবিত আছেন এবং সালাত আদায় করছেন। আল্লাহ পাক শহিদদের প্রসঙ্গে বলেছেন, বরং তারা জীবিত, তাদের প্রভুর কাছ থেকে রিযিকপ্রাপ্ত হচ্ছেন (আল ইমরান ১৬৯)। আর বলা বাহুল্য যে, নবিগণ শহিদদের তুলনায় উচ্চ মর্যাদার। সে কারণে তাদের বরযখী জীবনের শক্তি শহিদ থেকে আরো বেশি পূর্ণাঙ্গ। রাসূল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ পাক নবিদের দেহ ভক্ষণ করা জমিনের জন্য হারাম করে দিয়েছেন, নবিগণ জীবিত এবং রিযিক পাচ্ছেন। তিনি আরো বলেন, নবিগণ তাদের নিজ নিজ কবরে জীবিত।

সুতরাং বুঝা গেল, সাধারণ ইমানদারদের থেকে ভিন্নতর বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত এক ধরনের বিশেষ বরযখী জিন্দেগী আছে নবিদের। আমাদের প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বরযখী হায়াত অন্যান্য নবিদের চেয়েও অধিকতর পরিপূর্ণ যা অতীব স্পষ্ট, তিনি আমাদের আমলসমূহ পর্যবেক্ষণ করছেন।’ নবম-দশম শ্রেণীর পাঠ্যবই আকাইদ ও ফিক্হ বইয়ের ১৩৩ পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে ‘নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রওজা মুবারক যেয়ারত করা আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম প্রধান উপায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা একথা বলে আমাদের নির্দেশ প্রদান করেছেন যে, আর যদি তারা নিজেদের আত্মার উপর জুলুম করে এবং আপনার কাছে এসে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং রসুল তাদের জন্য সুপারিশ করেন তবে তারা আল্লাহকে পাবে তওবা কবুলকারি দয়াবান (নিসা ৬৪)।

এরপর লেখা হয়েছে, এই আয়াত রসুল সা. এর দরবারে যাওয়ার উৎসাহ প্রদান, তার দরবারে গিয়ে ইস্তেগফার করা এবং গুনাহগারের জন্য আল্লাহর দরবারে তার সুপারিশ-চায় তা তার জীবদ্দশায় কিংবা ওফাতের পর- এসব কিছুর উপর নির্দেশ প্রদান করে। রওজা শরীফে এ জন্য যাওয়া উত্তম কেননা, প্রিয়নবি সশরীরে রওজাপাকে জীবিত। তিনি তার উম্মতের সালামের জওয়াব দেন। নবী করিম সা. হতে বর্ণিত আছে তিনি বলেন, যে আমার রওজা যিয়ারত করবে তার জন্য আমার শাফায়াত ওয়াজিব হয়ে যাবে। (বায়হাকি, দারেকুতনি) আল্লাহর হাবিব সা. আরো বলেন, যে ব্যক্তি আমার ইন্তেকালের পর আমার রওজা যিয়ারত করবে সে যেন আমার জীবদ্দশায় আমার সাথে সাক্ষাৎ করল। (তবারানি, মুজামুল আওসাত)

১৩৫ পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে রসুলের দরবারে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা দেয়া মুনাফিকদের অভ্যাস এবং তাঁর দরবারে একনিষ্ঠ হয়ে থাকা আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের পাথেয়। রসুলের দরবার বলতে এখানে রসুলের রওজা বোঝানো হয়েছে। বিশিষ্ট আলেমদের অভিমত, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়ার আল হাদিস বিভাগের প্রফেসর ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর এবং একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আল ফিকহ্ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ড. আবু বকর মুহাম্মদ জাকারিয়া মজুমদার দু’জনে একই মত পোষণ করে বলেন, রসুল সা: কবরে সশরীরে জীবিত, কেয়ামত পর্যন্ত তিনি সৃষ্টির সকল অবস্থা অবলোকন করবেন এ কথা বিশ্বাস করা শিরক। সৃষ্টির সকল অবস্থা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কেউ অবলোকন করতে পারে না।

রসুল সা:-এর ক্ষমতা আছে বিশ্বাস করলে তাকে আল্লাহর সমকক্ষ করা হয়। তা ছাড়া সৃষ্টির সূচনাতে যখন আল্লাহ ছাড়া কেউ ছিল না তখন রসুল সা: ছিলেন এ কথা বিশ্বাস করাও শিরক এবং তাকে আল্লাহর সমকক্ষ করার শামিল। আর রসুলের মাজারে যাওয়ার সমর্থনে সূরা নিসার যে ৬৪ নম্বর আয়াত ব্যবহার করা হয়েছে তাও মিথ্যা। এ আয়াত মাজারে যাওয়ার সপক্ষে নয় বরং রসুল সা: জীবিত অবস্থায় জীবিত পাপী মুনাফিকদের বিষয়ে এ আয়াত নাজিল হয়েছে। সূরা নিসার ৬৪ নং আয়াতের আগের তিনটি আয়াত পড়লেই তা যে কারোর কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে। এটি বোঝার জন্য কোনো ব্যাখ্যা বা তাফসিরেরও দরকার নেই।

এ দুই শিক্ষক বলেন, শহিদগণ জীবিত তা আল্লাহ কুরআনে বলেছেন। কিন্তু সেই জীবিত আখেরাতে যেমন করে জীবিত থাকা বোঝায় সেটি বোঝানো হয়েছে; জাগতিক জীবনের মতো করে নয়। জাগতিক জীবনের মতো করে তারা সশরীরে কেউ জীবিত নেই। রসুল সা:ও জাগতিক জীবনের নিয়মে সশরীরে কবরে জীবিত নেই। আখিরাতের নিয়মে তিনি জীবিত। কবরে তিনি সশরীরে জীবিত আছেন এ বিশ্বাস মানুষকে শিরক ও কবর পূজার দিকে ধাবিত করে। প্রফেসর আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর বলেন, রাসূলুল্লাহ সা:-এর ইন্তেকালের পরের ঘটনাগুলোÑ বুখারি, মুসলিম ও অন্যান্য হাদিস গ্রন্থে পাঠ করলে আমরা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারি যে, সাহাবীরা রাসূলুল্লাহকে কবরের মধ্যে কখনোই জাগতিক জীবনের অধিকারী বলে মনে করেননি।

শাইখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্স সেন্টারের মহাপরিচালক মুফতি মুহাদ্দিস এম মিজানুর রহমান বলেন, রসুল সা: কবরে সশরীরে জীবিত এ বিষয়টা এমনভাবে পাঠ্যবইয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে যাতে শিরক বিদ’আতের প্রতি উৎসাহিত করবে মানুষকে। মাদরাসা বায়তুল উলুমের মুহতামিম মুফতি মাওলানা জাফর আহমাদ বলেন, আমরা হায়াতুন্নবীতে বিশ্বাস করি। কিন্তু তিনি কবরে বসে সব কিছু দেখছেন এটা বিশ্বাস করা শিরক।

(এ সিরিজ প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয় ২০১৪ সালে। তখন প্রফেসর ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর জীবিত ছিলেন। ২০১৪ সালে সিরিজ প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হলেও তখনকার বিদ্যমান পরিস্থিতির কারণে প্রতিবেদন প্রকাশ স্থগিত রাখা হয়। আজকের প্রতিবেদনের বিষয় ২০১৪ সালের পাঠ্যবইয়ে যেমন ছিল ২০১৯ সালের পাঠ্যবইয়েও তেমন রয়েছে।

পাঠকের মতামত