জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ঘটনায় মুখ খুলেছে ভুক্তভোগীরা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মদ্যপ অবস্থায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আটকের যে খবর প্রকাশ করা হয়েছে তার প্রতিবাদ জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। তারা বলেন, জাবি প্রশাসন আমাদের হাতে মদের বোতল ধরিয়ে ছবি তুলেছে, এটা আমরা আনিনি।

তারা অভিযোগ করেন, ঢাবির টিএসসিতে কিছুদিন আগে পুলিশের হাতে জাবির বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আটক হন। এর জের ধরেই জাবি প্রশাসন আমাদেরকে হেনস্তা করে আমাদের ব্যক্তিগত এবং সামাজিক জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছেন।

ভুক্তভোগী ঢাবি শিক্ষার্থী সামিহা আহমেদের বক্তব্য উল্লেখ করা হল :

সামিহা আহমেদ : জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ৩ দিন ব্যাপী হিম উৎসব গত ২০ জানুয়ারি রাত প্রায় ১ টার দিকে সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। তখন জাবির একটি একতলা বাস সিট সংকুলান না হওয়ায় হিম উৎসবের কয়েকজন আর্টিস্ট ও অল্প কিছু শিক্ষার্থীদের নিয়ে ঢাকায় ফেরে। এসময় আর কোন বাস রাস্তায় ছিল না।

তাই বাইরে থেকে আসা ছাত্রদের মধ্যে কেউ কেউ হলে ঘুমাতে যান। যারা সকালের বাসে ঢাকায় ফিরবেন তারা হিম উৎসব যেখানে অনুষ্ঠিত হয়, সেই সেলিম আল দীন মুক্তমঞ্চের আশেপাশে অপেক্ষা করছিলেন। আমরা অপেক্ষা করছিলাম মুক্তমঞ্চের পাশে সেন্ট্রাল ফিল্ডে।

এসময় জাবির একটি ছেলে আমাদের কাছে এসে জানতে চায় আমরা ঢাকার কিনা, তখন আমরা বলি আমরা সকালের বাসে ঢাকায় যাবো। সে আমাদের জানায় যে প্রক্টরিয়াল টিম ক্যাম্পাসের বাইরে থেকে আসা লোকজনদের হেনস্তা করছে, তাই আমরা যেন জাবির টিএসসির ভেতরে যাই।

আমরা যখন জাবির টিএসসির ভেতরে যাচ্ছিলাম তখন জাবির সিকিউরিটি অফিসার সুদীপ্ত শাহীন দুইজন গার্ডকে নিয়ে আমাদের কাছে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে জিজ্ঞেস করেন, “আপনারা কি এই ক্যাম্পাসের?”

আমরা যখন উত্তর দিই আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তখন তারা বলেন, “আপনাদের এত রাতে এই ক্যাম্পাসে থাকার অনুমতি কে দিয়েছে? আমাদের জাবির ছেলেরা কি ঢাবিতে গিয়ে এভাবে রাতে থাকতে পারবে?” তখন আমরা উত্তর দিই, “আমরা জাবির ছাত্রদের আমন্ত্রণেই হিম উৎসবে এসেছি এবং প্রোগ্রাম শেষ হতে দেরি হওয়ায় রাতে ঢাকায় ফেরার বাস পাই নি। আমরা সকালের বাসে চলে যাবো বলে অপেক্ষা করছি।”

আমরা তখনও বুঝতে পারিনি ঘটনাটিকে কোন দিকে মোড় ঘোরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। দুইজন গার্ডের একজন তখন কোথাও থেকে একটি মদের বোতল জোগাড় করে নিয়ে উপস্থিত হন।

তখন সুদীপ্ত শাহীন আমাদের কাছে জানতে চান এটি আমাদের কিনা। প্রথমত বোতলটি আমাদের হওয়ার কোন প্রশ্নই আসে না, দ্বিতীয়ত এই বোতল আমাদের সাথে পাওয়া যায়নি। অতএব স্বাভাবিকভাবেই আমরা জোর গলায় বলি, “এই বোতল আমাদের না।”

তখন সুদীপ্ত শাহীন আমাদের দিকে উদ্ধতভাবে এগিয়ে আসেন এবং বলেন, “আপনারা কোনো কথা বলবেন না, এক্ষুনি গাড়িতে উঠুন।” তখন আমরা জোর গলায় বলি, “আমরা কোন অপরাধ করিনি এবং আমাদের সাথে কোন অ্যাকশনে যাওয়ার আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের সাথে কথা বলতে হবে।”

ঘটনাস্থলে তখন ঢাবি ও জাবির আরও কয়েকজন শিক্ষার্থীও উপস্থিত ছিলেন। তখন সুদীপ্ত শাহীন আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেন এবং আমাদের ও উপস্থিত ঢাবি ও জাবি শিক্ষার্থীবৃন্দের সকল কথা উপেক্ষা করে জোরপূর্বক গাড়িতে করে আমাদেরকে নিয়ে যান চিফ সিকিউরিটি অফিসারের অফিসে।

উক্ত সময়ে একজন মেয়ের হাতে জোরপূর্বক মদের বোতল তুলে দেয়ার চেষ্টা করায় তিনি প্রতিবাদ করলে সুদীপ্ত শাহীন হুমকি দিয়ে বলে উঠেন, “আমি চাইলে আরো অসংলগ্ন হতে পারি।” তিনি পুরোটা সময় ভয়-ভীতি প্রদর্শণ অব্যাহত রাখেন এবং মারধরের হুমকি দিয়ে জোর করে আমাদের হাতে মদের বোতল তুলে দিয়ে ছবি তোলেন।

পরবর্তীতে জাবির সাংবাদিক, ঢাবি ও জাবির শিক্ষার্থীবৃন্দ ও জাবির সিকিউরিটি টিমের উপস্থিতিতে আমাদের ব্যাগ ও শরীর পরিপূর্ণভাবে তল্লাশি করেও আমাদের কাছ থেকে কোন আপত্তিকর বস্তু বা মাদকদ্রব্য খুঁজে পাওয়া যায়নি।

তখন পাশ থেকে সিকিউরিটি টিমের একজন বলে উঠেন, “তল্লাশি করে লাভ নাই, যে বোতল পাইছেন ওইটা দিয়েই ধরায়া দেন।” তখন আমরা জোর গলায় আবারও বলি, মদের বোতলটি আমাদের সঙ্গে পাওয়া যায় নি। পরে সুদীপ্ত শাহীন বারবার বলতে থাকেন, “আমাদের ভার্সিটির ছেলেদের ধরায়ে দিছেন, আপনারা কি পার পেয়ে যাবেন নাকি!”

যদিওবা সাংবাদিকসহ সকলের উপস্থিতিতে তল্লাশি করেও আমাদের কাছে কোন মাদকদ্রব্য বা আপত্তিকর বস্তু পাওয়া যায়নি, তবুও পরদিন সকাল হতে অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোতে ‘মদ, গাঁজা ও ইয়াবাসহ আটক’ শিরোনামে মিথ্যা সংবাদ প্রচারিত হতে থাকে এবং আমাদের বক্তব্যকে বদলে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয় ।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, গত ১৪ জানুয়ারি, ২০১৯ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে ইয়াবা সেবনরত অবস্থায় জাবির এক শিক্ষার্থী আটক হন। সুদীপ্ত শাহীন এই বিষয়টি বারবার করে উল্লেখ করতে থাকেন এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বুঝতে পারি যে এই ঘটনারই জের ধরে তিনি আমাদের ফাঁসাতে চাচ্ছেন।

তিনি তার অফিসে আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য লিপিবদ্ধ করেন এবং তারপর গাড়িতে করে আমাদেরকে জাবির টিএসসিতে নামিয়ে দেয়া হয়। এখানে জাবির টিএসসির একটি রুমে ঢাবির অর্ধশত শিক্ষার্থীদেরকে প্রায় বন্দিদশায় সারারাত অবস্থান করতে বাধ্য করা হয় এবং এখানে এসে আমরা জানতে পারি ১৪ জানুয়ারিতে জাবি শিক্ষার্থী আটক ঘটনার জের ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য শিক্ষার্থী ও হিম উৎসবের অসংখ্য আমন্ত্রিত শিল্পীকে সন্ধ্যা থেকে হেনস্তা করা হচ্ছে।

আমাদের সম্পর্কে অনলাইন নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত সমস্ত তথ্য অসম্পূর্ণ, অসংলগ্ন এবং সম্পূর্ণভাবে উদ্যেশ্যপ্রণোদিত। বিশেষত এই ঘটনায় হিম উৎসবকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য ও গত ১৪ জানুয়ারি ঢাবি টিএসসিতে জাবি শিক্ষার্থীর পুলিশ কর্তৃক আটক হবার জের ধরেই জাবি প্রশাসন আমাদেরকে হেনস্তা করে আমাদের ব্যক্তিগত এবং সামাজিক জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছেন।

আমরা জাবি প্রশাসনের এহেন হীন আচরণ ও বিভিন্ন নিউজ পোর্টালের অসম্পূর্ণ ও পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ উপস্থাপনের ঘটনার প্রতিবাদ করছি। এই ব্যাপারে আমরা আইনি পদক্ষেপ গ্রহন করবো।

পাঠকের মতামত