গাজীপুরে এক থাপ্পড় দেওয়ায় স্বামীকে ৬ টুকরো

গাজীপুরের শ্রীপুরে পোশাক কারখানা শ্রমিককে হত্যার পর ছয় টুকরো করার কারণ জানা গেছে। বেতনের টাকা নিয়ে কলহের জেরে স্ত্রীকে থাপ্পড় দেওয়ায় তাঁর হাতে এমন নৃশংসভাবে খুন হন স্বামী রফিকুল ইসলাম (৩০)। আজ শনিবার গাজীপুরের পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে স্ত্রী জীবন নাহার (২৫) তাঁর স্বামী রফিকুলকে ছয় টুকরো করে নৃশংস খুনের কথা স্বীকার করেন।

পুলিশ সুপার (এসপি) শামসুন্নাহার সংবাদ সম্মেলনে বলেন, শ্রীপুর উপজেলার গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ির গিলারচালা এলাকার মেঘনা কারখানার সীমানা প্রাচীরের পাশে আবদুল হাই মাস্টারের বাড়িতে ভাড়ায় থাকতেন রফিকুল ইসলাম ও জীবন নাহার দম্পতি। রফিকুল স্থানীয় ‘হাউ আর ইউ’ পোশাক কারখানায় লোডার ছিলেন আর তাঁর স্ত্রী জীবন নাহার একই এলাকার মেঘনা নিট কম্পোজিট কারখানায় সুইং অপারেটর। রফিকুলের বাড়ি ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার উলমাকান্দি এলাকায় এবং জীবন নাহারের বাড়ি নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার বিষমপুর গ্রামে।

এসপি শামসুন্নাহার জানান, স্বামী রফিকুল বেতন পেতেন সাত হাজার টাকা আর তাঁর স্ত্রী জীবন নাহারের বেতন ১৩ হাজার টাকা। বিভিন্ন সময় স্ত্রীর কাছে বেতনের টাকা চাইতেন রফিকুল, কিন্তু তিনি বেতনের টাকা স্বামীর কাছে না দিয়ে মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিতেন। এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই কলহ হতো।

‘সপ্তাহ খানেক আগে, রফিকুলকে ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন জীবন নাহার। গত বৃহস্পতিবার সকালে এসব নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়, একপর্যায়ে স্ত্রীকে সজোরে থাপ্পড় মারেন রফিকুল। এতে স্বামীর ওপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন জীবন নাহার। প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ঘরে পায়চারি করতে থাকেন তিনি। এ ঘটনার পর রফিকুল শুয়ে পড়েন। পরে কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই জীবন নাহার ইট দিয়ে ঘুমন্ত স্বামীর মাথায় সজোরে আঘাত করেন। মাথায় আঘাত পেয়ে রফিকুল খাট থেকে নিচে পড়ে যান। এমতাবস্থায় জীবন নাহার ইট দিয়ে তাঁর স্বামীর মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করলে অচেতন হয়ে পড়েন রফিকুল। একপর্যায়ে স্বামীর গলায় গামছা দিয়ে শ্বাসরোধ করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন স্ত্রী।’

‘পরে তাঁর লাশ ঘরের ওয়্যারড্রোবে ঢুকিয়ে রেখে কারখানায় কাজে চলে যান জীবন নাহার। রাতে বাসায় ফিরে পাশে বোন লুৎফুন্নাহারের বাসায় যান। বোনের বাসায় রাতের খাওয়া-দাওয়া করেন জীবন নাহার, বোনকে জানান রফিকুল রাগ করে বাসা থেকে চলে গেছেন। রাত ১১টার দিকে জীবন নাহার ঘরে ফিরে রফিকুলের লাশটি ওয়্যারড্রোব থেকে বের করেন। লাশের পরিচয় গোপন করতে বটি দা’ দিয়ে নিহতের দুই হাত কুনই থেকে, দুই পা হাটু থেকে এবং ঘাড় থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন।’

‘পরে মাথা, হাত ও পা বিচ্ছিন্ন মরদেহটি বস্তায় ভরে পাশের বাঁশঝাড়ে ফেলে দেন। আর দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন পা দুটি অদূরে একটি পরিত্যক্ত টয়লেটের পেছনে এবং দেহ বিচ্ছিন্ন মাথা ও দুই হাতের অংশগুলো ময়লার ড্রেনে ফেলে দেন। পরদিন সকালে এলাকাবাসী বাঁশঝাড়ের নিচে রক্তমাখা বস্তা ও লাশ দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেয়। বিকেলে ঘটনাস্থল থেকে নিহত রফিকুলের লাশের ছয় টুকরো লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। খণ্ডিত অংশগুলো ওই এলাকার ৩০০ থেকে ৪০০ গজের ব্যবধানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলে রাখা হয়েছিল। পুলিশ স্ত্রী জীবন নাহারকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে জীবন নাহার নৃশংসভাবে তাঁর স্বামীকে খুনের কথা স্বীকার করেন।’

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত জীবন নাহার জানান, প্রায় পাঁচ বছর আগে রফিকুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তাদের ঘরে মারিয়া আক্তার রোজা নামে চার বছরের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। রোজা বেশিরভাগ সময়ই তার নানির বাড়ি থাকে। ঘটনার দিনও রোজা বাসায় ছিল না।

শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাবেদুল ইসলাম জানান, এ ব্যাপারে নিহত রফিকুলের বাবা আবদুল লতিফ বাদী হয়ে জীবন নাহারকে আসামি করে শ্রীপুর থানায় মামলা করেছেন। আটক জীবন নাহারকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে গভীরভাবে তদন্ত চলছে।

সংবাদ সম্মেলনে গাজীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল শেখ, শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাবেদুল ইসলামসহ পুলিশের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

পাঠকের মতামত