বাতি জ্বলছে ফ্যানও ঘুরছে, কিন্তু চিকিৎসক নেই

সোমবার বেলা সাড়ে ১১টা। নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাইনুল হাসানের কক্ষের দরজা বন্ধ। একটু ফাঁক দিয়ে দেখা গেল তিনি কক্ষে নেই। তবে কক্ষের বৈদ্যুতিক সবগুলো বাতি জ্বলছে, ফ্যানও ঘুরছে। তার পাশেই আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. সাইফুল ইসলামের কক্ষ। তার কক্ষে তালা ঝুলছে। এমন চিত্র নিত্যদিনের। তবে কর্মস্থলে ডাক্তারদের অনুপস্থিত থাকার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কড়া নির্দেশনার পরও সোমাবার এমন চিত্র দেখা গেছে।

সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নিচতলার পেছনে বহিঃবিভাগ। সেখানে পর্যাপ্ত আলো নেই। তার মধ্যে দীর্ঘ লাইন রোগীদের। বেশির ভাগ রোগী নারী ও শিশু। কিন্তু নেই কোনো শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। বহিঃবিভাগের এসব রোগী সামাল দিচ্ছেন একজন মেডিকেল অফিসার ডা. নাজিমা তাসনিম। জরুরি বিভাগে পাওয়া গেল ডা. সোহবার হোসেনকে। কর্মস্থলে রয়েছেন ডেন্টাল সার্জন ডা. সাজেদুল আলম ও দুইজন উপ-সহকারী চিকিৎসক।

হারবাল চিকিসৎক ডা. মো. আবদুল গনি নেই। তার কক্ষে তালা ঝুলছে। এছাড়া জুনিয়র গাইনি ডা. শামছুন নাহার, ডা. মো. রিয়াজ উদ্দিন ও সহকারী সার্জন মো. শহীদ উল্যাহকেও কর্মস্থলে পাওয়া যায়নি।

সোনাইমুড়ী উপজেলায় প্রায় তিন লাখের বেশি লোকের স্বাস্থ্যসেবা বর্তমানে হুমকির মুখে। বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত এখানকার স্বাস্থ্য বিভাগ। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক সংকটসহ নানা অনিয়ম গ্রাস করেছে সার্বিক কর্মকাণ্ডকে। ফলে এখানকার স্বাস্থ্য বিভাগ জনগণের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে পারছে না।

এ উপজেলায় ১০টি ও একটি পৌরসভায় বর্তমানে তিন লাখেরও বেশি লোকের বসবাস। এ বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য একটি মাত্র ৫০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, ১০টি ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র রয়েছে। সব মিলিয়ে ২২ জন ডাক্তার থাকার কথা থাকলেও আছেন ১১ জন। তাও আবার জুনিয়র কনসালটেন্ট (সার্জারি) ডা. মোহাম্মদ ইককাল হোসেন ও জুনিয়র (অ্যানেসথেসিয়া) ডা. মো. আক্তার হোসাইনকে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে সংযুক্ত এবং জুনিয়র (কার্ডিওলোজি) ডা. মোজাম্মেল হককে হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে সংযুক্ত করা হয়েছে। প্যাথলোজির চিকিৎসক ডা. মো. আবু ইব্রাহিম তো দীর্ঘ দিন থেকে অনুপস্থিত।

অনুমোদিত পদের মধ্যে জুনিয়র কনসালটেন্ট (শিশু) পদ খালি পড়ে আছে। তাছাড়া অর্থো, ইএনটি, চর্ম ও যৌন, চক্ষু সহকারী সার্জন, অ্যানেসথেসিয়া পদের বিপরীতে জনবল নিয়োগ দেয়া হচ্ছে না। এছাড়া ১৪ জন সিনিয়র স্টাফ নার্স থাকার কথা থাকলে ও আছে মাত্র ছয়জন এবং মিডওয়াইফ চারজনের স্থলে রয়েছে তিনজন। যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগণ্য। তাছাড়া বিভিন্ন অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতির কারণে এখানকার জনগণ সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ২০১১ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করে।

সোমবার দুপুর ১টা পর্যন্ত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে রোগীদের রেজিস্ট্রার খাতায় ২৮ জন রোগী থাকলে বাস্তবে দেখা গেল ১৮ জন রোগী আছে সব মিলে। অনেকে বাড়ি চলে গেলেও রোগীদের খাবার সরবরহারে অনিয়ম আর দুর্নীতির জন্য রেজিস্ট্রারে ২৮ জন লেখা রয়েছে। রোগীদের অনেকে অভিযোগ করেছেন- সকালে ডাক্তার একবার আসে আর আসে পরের দিন। আর ওষুধ তো বাজার থেকেই কিনতে হয়।

সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান সহকারী কাম হিসাবরক্ষক মো. কতুব উদ্দিন জানান, উপজেলা ও জেলাতে তিনজন ডাক্তার মিটিংয়ে যাওয়ায় তারা হাসপাতালে নেই।

রোগীরা অভিযোগ করেন, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাইনুল হাসানের সকল অনিয়মই নিয়ম। কারণ এর আগেও তিনি এ উপজেলায় মেডিকেল অফিসার হিসেবে দায়িত্বে থাকার সময় কোনো নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা করতেন না। সোনাইমুড়ীতে নিজের প্রাইভেট হাসপাতাল হওয়ার কারণে বেশির ভাগ সময় তিনি ওই হাসপাতালে ব্যয় করেন।

এ নিয়ে নানা অভিযোগ থাকার পরও এমন একজন দায়িত্বহীন চিকিৎসক কীভাবে এখনো চাকরি করেন, আবার তাকে উপজেলা হাসপাতালের দায়িত্বও দেয়া হয়। তিনি হাসপাতালে আসেন বেলা ১২টার পর। তাও অনিয়মিত। আবার আসলে নিজ কক্ষে বসেই টাকার বিনিময়ে রোগী দেখেন। তিনি যখন অনিয়ম করেন তার অধীনস্তরা তো সুযোগ নিবেই।

হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকদের না পাওয়ার বিষয়ে সিভিল সার্জন ডা. বিধানচন্দ্র সেন গুপ্তের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে অফিসে চা খাওয়ার আমন্ত্রণ জানান।

পাঠকের মতামত