যন্ত্র বসিয়েও গ্রামে রাখা যায় না ডাক্তারদের

সাত উপজেলায় ডাক্তারের পদ ১৬০টি। বাস্তবে কাজ করছেন মাত্র ৪০ জন। কোনো উপজেলাতেই দুই-চারজনের বেশি চিকিৎসক নেই। এককথায় ৭৫ শতাংশ ডাক্তারের পদই ফাঁকা পড়ে আছে। কোথাও কোথাও ২০ জনের জায়গায় মাত্র তিনজন ডাক্তারও দায়িত্ব পালন করছেন। গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় গাইবান্ধার সিভিল সার্জন ডা. আব্দুস সাকুর হতাশার সঙ্গে কালের কণ্ঠকে জেলার স্বাস্থ্যসেবার এই চিত্রটি দেন। তিনি বলেন, ‘নতুন যারা আসে তাদের সবাই বেশি দিন থাকে না, অনেকেই বিভিন্ন অজুহাতে চলে যায়।’ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, এই চিত্রটি সারা দেশের। সাধারণ মানুষই ডাক্তারদের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ তুলে আসছে নিয়মিত। প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রীরা অনেকবার এ ব্যাপারে কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। এমনকি বায়োমেট্রিক যন্ত্র বসিয়েও চিকিৎসকদের মাঠে আটকে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। কর্মস্থলে রাখা যায়নি ফাঁকিবাজ চিকিৎসকদের।

সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের এক অভিযানের পরও বিষয়টি বেশ জোরালো হয়ে ওঠে। দুদকের মতে, প্রায় ৪০ শতাংশ চিকিৎসক কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টান্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির প্রতিবেদনেও উঠে আসে এমন চিত্র। এ ছাড়া এক বছর আগে কালের কণ্ঠ’র নিজস্ব অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ৩৩তম বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের প্রায় ৭৫ শতাংশই কোনো না কোনো অজুহাতে সংশ্লিষ্ট এলাকা থেকে চলে গেছেন। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীসহ গত দুই মেয়াদের দুই স্বাস্থ্যমন্ত্রীও বেশ কঠোর ছিলেন চিকিৎসকদের মাঠে রাখার ক্ষেত্রে। এমনকি নতুন চিকিৎসকদের নিয়োগ-পরবর্তী কর্মস্থলে যোগদান অনুষ্ঠানগুলোতে রীতিমতো গ্রামে থাকার জন্য অঙ্গীকারও করা হয়েছিল। এ জন্য নিজ জেলায় নিয়োগের পদ্ধতি চালু এবং চাকরির প্রথম দুই বছর গ্রামে থাকার ক্ষেত্রেও বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়। উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বায়োমেট্রিক যন্ত্র বসানো হলে তাও নষ্ট করে ফেলার অভিযোগ ওঠে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে। এত কিছুর পরও অবস্থার উন্নতি না হওয়ার পেছনে তদবির, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ক্ষেত্রবিশেষে প্রভাবশালী আমলাদের হস্তক্ষেপ থাকে বলে বিভিন্ন মহলেই আলোচিত হয়। সর্বশেষ গতকাল রবিবার এই অনুপস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কঠোর ভাষায় চূড়ান্ত সতর্কতা দিলেন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এমন অবস্থানের পর গতকাল সন্ধ্যায় মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার বাস্তব চিত্র জানার চেষ্টা করলে গাইবান্ধার সিভিল সার্জন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কী যে করি বুঝতে পারছি না। একেকটি উপজেলায় গিয়ে রোগীদের যেভাবে ভিড় দেখি তাতে খুবই খারাপ লাগে। যে কয়জন চিকিৎসক আছেন তাঁদের ওপরও অমানুষিক চাপ পড়ে।’

গতকাল নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রশাসনিক শাখার একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, ২০১৪ সালে সরকার একযোগে যে ছয় হাজার ডাক্তার নিয়োগ দিয়ে তাঁদেরকে গ্রামে পোস্টিং দিয়েছিল তাঁদের প্রায় ৭৫ শতাংশই দুই বছর না যেতেই গ্রামছাড়া হয়েছিলেন। এখনো সেই একই বলয়ে ঘুরছে গ্রামের স্বাস্থ্যসেবা। এর পেছনে চিকিৎসকদের সংগঠনগুলোর ভূমিকাকেও দায়ী করা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসকদের থাকার ব্যবস্থা আগের চেয়ে অনেকটাই ভালো হয়েছে। আরো পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে তাঁদের জন্য। গাড়ি দেওয়া হবে, আবাসন ব্যবস্থা হবে। আরো প্রণোদনাও দেওয়া হবে।

গতকাল প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনার পর বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগের পরিস্থিতি আর এখনকার পরিস্থিতি এক নয়। আমরা কোনো চিকিৎসকের ব্যক্তিগত অন্যায়-অনিয়মকে প্রশ্রয় দেব না। বরং প্রধানমন্ত্রী যে বার্তা দিয়েছেন আমরা তাকে স্বাগত জানাই। এ ক্ষেত্রে বিএমএ সরকারকে সহায়তা করবে। এ ছাড়া ইন্টার্নির পর এক বছর গ্রামে প্র্যাকটিস করা বাধ্যতামূলক করাও ইতিবাচক হবে বলে আমি মনে করি।’

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক হিসেবে প্রশাসনিকভাবে দীর্ঘদিন সরকারি চিকিৎসকদের তদারকির অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এবং বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মাহসচিব অধ্যাপক ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি অনেকটাই বিব্রত এ কারণে যে মাঠের চিকিৎসকদের বিষয়েও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এমনভাবে কথা বলতে বাধ্য হয়েছেন। এর দায় তো আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর এড়াতে পারে না। চিকিৎসকদের গ্রামে রাখতে না পারার ব্যর্থতা তো যাঁরা ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আছেন তাঁদেরকে নিতে হবে। মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে বিশৃঙ্খলার কারণেই তরুণ ও নবীন চিকিৎসকদের মাঠে রাখা যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে সুষ্ঠু পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। এরপরও বলব, প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান অবশ্যই সময়োপযোগী। মানুষের চিকিত্সাসেবা নিশ্চিত করতে হলে কঠোর হতেই হবে। সরকারি চাকরি নেবে, সরকারের বেতন নেবে আর দায়িত্ব পালন করবে না, সেটা তো হবে না। আমরাও সাংগঠনিকভাবে এসবকে মানব না।’

ওই চিকিৎসক নেতা বলেন, অনুপস্থিতির তথ্য নিয়েও বিভ্রান্তি আছে। দুদক যে তথ্য দিয়েছে সেটা অনেক কিছুর ব্যাখ্যার দাবি রাখে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ২০১২-১৩ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতের সর্বশেষ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার এইচপিএনএসডিপির (স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা, পুষ্টি খাত উন্নয়ন কর্মসূচি) অর্থ থেকে দেশের সবগুলো উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সে একটি করে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বায়োমেট্রিক মেশিন স্থাপনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়। বিশেষ সেন্সরযুক্ত ওই মেশিনগুলো ব্যবহার করে তাত্ক্ষণিকভাবে ঢাকায় বা কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে কোনো ডাক্তার কখন তাঁর কর্মস্থলে উপস্থিত হয়েছেন তা শনাক্ত করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে আগেই সব ডাক্তারের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল হাসপাতালে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রবেশ করেই প্রথমে ওই যন্ত্রে নিজের আঙুল পুশ করতে হবে এবং কর্মস্থল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময়ও একই কাজ করতে হবে। প্রতিটি যন্ত্র ৩০০ ডলার করে কেনা হয়েছিল। এ ছাড়া এসব যন্ত্র যাতে চুরি না যায় এ জন্য লোহার খাঁচা দিয়ে নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করে প্রতিটি যন্ত্র রাখা হয়। যদিও ওই একদিক থেকে যন্ত্র বসানো আরেক দিক থেকে নষ্ট করে ফেলার ঘটনায় শেষ পর্যন্ত সারা দেশে সব উপজেলায় ওই মেশিন স্থাপনও করা যায়নি। যে স্থানটুকু দিয়ে আঙুল পুশ করা হয় ঠিক ওই অংশটুকুই ভেঙে বা নষ্ট করে ফেলার প্রমাণ মিলেছে। এমনকি যেসব স্থানে এখনো ওই যন্ত্র স্থাপন করা হয়নি সেগুলোতে যাতে স্থাপন করা না হয় সে জন্যও নানা তত্পরতা চালানো হয়। ফলে ওই প্রক্রিয়া একরকম থেমে আছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক শাখার কর্মকর্তারা জানান, ডাক্তারদের উপস্থিতি নথিবদ্ধ করার জন্য বসানো অত্যাধুনিক বায়োমেট্রিক যন্ত্রটি নষ্ট করে ফেলা হয়। কিছুদিন আগেও দেশের সব সিভিল সার্জন এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো এক আদেশে নিজ নিজ হাসপাতাল বা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকদের কর্মস্থলে হাজিরা মনিটরিংয়ের জন্য স্থাপিত বায়োমেট্রিক মেশিন নষ্ট করার বিষয়ে ব্যবস্থা নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে অবহিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু ওই নির্দেশে আশানুরূপ সাড়া পায়নি অধিদপ্তর। সিভিল সার্জন বা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা কোনো তথ্যই পাঠাননি।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র থেকে জানা যায়, গত কয়েক বছরে সারা দেশে ব্যাপকভাবে গ্রামপর্যায়ে অবকাঠামো নির্মাণ হয়েছে এবং হচ্ছে। ৩১ বেডের হাসপাতাল ৫০ বেডে উন্নীত করা হয়েছে, আধুনিক যন্ত্রপাতি দেওয়া হচ্ছে; কিন্তু সংকট লেগে আছে চিকিৎসকের। গ্রামে থাকার শর্তে চাকরি নিয়েও পদায়ন হওয়ার পর পাল্টে যায় বেশির ভাগ চিকিৎসকের আচরণ। মাঝে কিছুদিন পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলেও এখন আবার রীতিমতো চিকিৎসকদের গ্রাম ছাড়ার পালা শুরু হয়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চেয়েও ভয়াবহ অবস্থা ইউনিয়নের ক্ষেত্রে।

পাঠকের মতামত